
একে তো যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্সে টানা দুই মৌসুম শিরোপাহীন থাকার পথে, এরমধ্যে চাউর হয়েছে নতুন খবর। মাঠের খেলার একের পর এক ব্যর্থতার প্রভাব নাকি ভালোভাবেই পড়েছে রিয়াল মাদ্রিদের ড্রেসিংরুমে। শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণই নেই, একের পর এক বিতর্ক আর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের খবরে উত্তাল ‘গ্যালাকটিকোদের’ ডেরা। এবার নতুন করে খবর চাউর হয়েছে, রিয়ালের স্কোয়াডের ভেতরকার ফাটল এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, আর এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রক্ষণভাগের অতন্দ্র প্রহরী আন্তোনিও রুডিগার।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘মুন্দো দেপোর্তিভো’-র এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রিয়াল মাদ্রিদের ড্রেসিংরুম এখন যেন এক ‘বারুদের স্তূপ’। সেখানকার পরিবেশ এতটাই থমথমে এবং বিষাক্ত যে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ফুটবলারদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই আর তিক্ততা এতটাই বেড়েছে যে ক্লাব কর্তৃপক্ষ চাইলেও নাকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।
বিশেষ করে রুডিগারকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জন এই আগুনে ঘি ঢেলেছে। শোনা যাচ্ছে, সতীর্থদের সঙ্গে জার্মান ডিফেন্ডারের সম্পর্কের অবনতি ড্রেসিংরুমের পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে। মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও এখন ক্লাবের অন্দরমহলের এই ‘অস্থিরতা’ নিয়ে ফুটবল বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
মাঠের পারফরম্যান্স রিয়ালের এই ‘বিস্ফোরক’ পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলেছে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার মুখোমুখি হওয়ার আগেই কার্যত লিগ শিরোপার দৌড় থেকে ছিটকে গিয়েছে লস ব্লাঙ্কোসরা। এরপর চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হার যেন কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে। গত ছয় ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতে জয় পেয়েছে রিয়াল। ফলে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো কোনো বড় ট্রফি ছাড়াই মৌসুম শেষ করতে হচ্ছে স্প্যানিশ জায়ান্টদের।
মুন্দো দেপোর্তিভোর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘রয়্যালসদের ড্রেসিংরুম এখন আক্ষরিক অর্থেই এক বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে।’ ফুটবলারদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের গুঞ্জন থামছেই না। এর মধ্যে বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে কোচ আলভারো আরবেলোয়ার বিরুদ্ধে খেলোয়াড়দের গণ-অসন্তোষ। ধারণা করা হচ্ছে, এই মৌসুম শেষ হওয়ামাত্রই তার বিদায় ঘণ্টা বেজে যাবে।
সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা হলো দলের তিন প্রাণভোমরা কিলিয়ান এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং জুড বেলিংহামকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া খবর। শোনা যাচ্ছে, এই তিন মহাতারকার মধ্যে চরম মনোমালিন্য চলছে এবং তারা একাধিকবার একে অপরের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়েছেন। ইগোর লড়াই আর আধিপত্য বিস্তারের এই দ্বন্দ্বে রিয়ালের আভিজাত্য এখন খাদের কিনারায়।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘মার্কা’ এবং ‘এএস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোচ আরবেলোয়ার সঙ্গে মিডফিল্ডার দানি সেবায়োসের একটি ব্যক্তিগত আলাপচারিতা চরম তিক্ততায় রূপ নেয়। পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে হয়েছে যে, সেবায়োস এই মৌসুমের বাকি সময় আরবেলোয়ার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
যদিও লা লিগায় স্পানিওলের মুখোমুখি হওয়ার আগে সংবাদ সম্মেলনে আরবেলোয়া বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ড্রেসিংরুমের ঘটনা বাইরে প্রকাশ না করাই ফুটবলীয় শিষ্টাচার, যা তিনি গত ২০ বছর ধরে মেনে চলছেন। তবে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে আন্তোনিও রুডিগারকে ঘিরে আসা খবরগুলো।
ইএসপিএন দাবি করেছে, সম্প্রতি রুডিগার এক সতীর্থের সঙ্গে বড় ধরনের হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন, যা ক্লাব কর্তৃপক্ষ গোপন করার চেষ্টা করেছিল। ‘মুন্দো দেপোর্তিভো’ যোগ করেছে যে, জার্মান এই ডিফেন্ডার নাকি রীতিমতো হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। শুধু তাই নয়, কোচ আরবেলোয়ার সঙ্গে দলের সিনিয়র সদস্য দানি কারভাহাল এবং তরুণ রাউল আসেন্সিওর সম্পর্কের টানাপোড়েনও এখন তুঙ্গে, যা রিয়ালের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে আলভারো আরবেলোয়ার বিদায় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। বছরের শুরুতে জাবি আলনসোর স্থলাভিষিক্ত হওয়া আরবেলোয়া ড্রেসিংরুমের শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। বিশেষ করে আন্তোনিও রুডিগারকে নিয়ে বিতর্ক থামছেই না; বায়ার্নের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের দ্বিতীয় লেগে জোসিপ স্টানিসিককে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামাল দিতে রিয়াল প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ এখন একজন কড়া শাসকের (কোচ) খোঁজে আছেন। ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-এর মতে, পেরেজের প্রথম পছন্দ সাবেক কোচ হোসে মরিরিয়ো। যদিও ‘স্পেশাল ওয়ান’ জানিয়েছেন রিয়াল থেকে এখনও কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেনি, তবে গুঞ্জন থামছে না। মরিনিয়ো ছাড়াও ফ্রান্স জাতীয় দলের দায়িত্ব ছাড়তে যাওয়া দিদিয়ে দেশম, ইয়ুর্গেন ক্লপ এবং মাসিমিলিয়ানো অ্যালেগ্রির নামও রিয়ালের পরবর্তী কোচ হিসেবে জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে।